জুম্মান (ছদ্মনাম) খুবই অসুস্থ। মাথার ভেতরে অসহনীয় ব্যথা আর জ্বর। এরমধ্যেই “দুম দুম” শব্দ। এটা তার বুকের ধুকপুক আওয়াজ, নাকি বাথরুমের দরজায় ধাক্কা দেওয়ার শব্দ, বুঝতে পারছিলো না জুম্মান। আরও আতঙ্কিত হয়ে পড়লো সে। এবার তার আতঙ্কের কারণ দরজার ওপাশ থেকে ভেসে আসা একটি কণ্ঠ। “বাইরে আয়, এখনই বাইরে আয়। তুই না ভালো ছেলে?” দরজার বাইরের সেই পৈশাচিক কণ্ঠ তাকে আবার ডাকল। এই কণ্ঠস্বর জুম্মানের খুব চেনা। আর এই কণ্ঠের জন্যই কত মানুষ এই লোকটিকে পছন্দ করে। লোকটি মাওলানা ইদ্রিস আহমেদ। ধর্মের প্রতি ‘ভালোবাসা’, শক্তিশালী খুতবা আর মানুষকে ধর্মীয় পথে নিয়ে আসার জন্য তিনি অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিলেন। “তোর এত সাহস, আমার কথা শুনিস না? তুই কি ভাবছিস, বাথরুমের মধ্যে নিজেকে আটকিয়ে রাখলেই আমি চলে যাবো?,” চিৎকার করলেন ইদ্রিস আহমেদ। এর মধ্যেই নামাজের সময় হয়ে আসছিল। তাই জুম্মান আশা করেছিল ইদ্রিস হুজুর এখন নামাজ পড়তে মসজিদে যাবেন। আজানের ধ্বনি ভেসে আসার পরেই জুম্মান খুশি হয়ে দরজা খুলতে যাচ্ছিল। এমন সময় আবারও পায়ের আওয়াজ পেলো সে। যে ক্ষীণ আশা জুম্মানের মনে উঁকি দিয়েছিল তা এক মুহুর্তেই যেন মিলিয়ে গেল। “তুই আমার থেকে পালাতে পারবি না। তাহলে কেন শুধু শুধু আমাকে দেরি করাস? প্রতিটি মুহুর্তে আমার কথা অমান্য করে যে পাপ তুই করিস, তার ভাগিদার তোর বাবা-মাকেও করছিস।” এভাবেই এক সময় দরজা খুলতে বাধ্য হয় জুম্মান। সে জানে আজ এই ঘটনা যেমন প্রথম নয়, তেমন শেষও নয়। কারণ এই মাদ্রাসার আরও অনেকের মতই জুম্মানও ইদ্রিস হুজুরের একজন শিকার। ঘটনার শুরু ২০১০ সালে, যখন জুম্মানের বয়স মাত্র ১২। রাজধানীর দক্ষিণখানে ইদ্রিস আহমেদের মাদ্রাসায় ভর্তির সময় জুম্মানের বাবা-মাকে বলা হয়েছিল, তাদের ছেলে সবচেয়ে তাড়াতাড়ি জান্নাতে যেতে পারবে। আর সেই পথ হচ্ছে ইদ্রিস হুজুরকে সেবা করা। প্রথম দিকে ইদ্রিসের দাড়িতে মেহেদি দিয়ে দেওয়া কিংবা তার শরীর টিপে দেওয়াই ছিল জুম্মানের কাজ। সমস্যা শুরু হয়, যখন কয়েকদিন পরেই জুম্মানকে নিজের ঘরে ডেকে নিয়ে কাপড় খুলতে বলেন ইদ্রিস। আতংকিত জুম্মান কিছু বুঝে ওঠার আগেই শিকারী পশুর মতো তাকে জড়িয়ে ধরা হয়। সেদিনের ঘটনা শেষ হলে জুম্মান এক ছুটে বাড়ি চলে এসেছিল। তবে এ থেকে মুক্তি পাওয়া এত সহজ ছিল না। কয়েকদিন পরেই ইদ্রিস মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষকে দিয়ে জুম্মানকে মসজিদে পাঠানোর কথা বলেন, যাতে জুম্মান ভালোভাবে কুরআন তেলাওয়াত করতে পারে। আর পবিত্র শিক্ষার ছদ্মবেশে ইদ্রিস প্রথমবারের মতো ধর্ষণ করতে পারে জুম্মানকে। অসহ্য ব্যথা, রক্ত আর চোখের জল দেখেও ইদ্রিসের মনে একটুও মায়া হয়নি জুম্মানের প্রতি। কিন্তু নিজের সাথে হওয়া এই অন্যায়ের কথা কীভাবে বলবে বাবা-মাকে? যারা মনে করেন জুম্মানের জান্নাতের পথ পূর্ণ হতে এইতো আর একটু বাকি! ভয়, শঙ্কা, অজ্ঞতা তার ঠোঁট বন্ধ করে রাখে, একদিন দু’দিন নয় টানা নয় বছরের জন্য। আর এই নয় বছরে প্রতিনিয়ত ইদ্রিস ধর্ষণ করেছে জুম্মানকে। সেসব ঘটনা ভিডিও করে জুম্মানকে দেখিয়ে ভয়ও দেখাতো ইদ্রিস। ইদ্রিস বলতো, "তুই যদি কাওকে আমার কথা বলিস তাহলে আমি ওর উপরে জ্বীনের আছর করব।" জুম্মান মাদ্রাসা পরিবর্তনের চেষ্টাও করেছে। কোনো লাভ হয়নি। ইদ্রিস সরাসরি তার বাসায় উপস্থিত হয়ে যেত। তার বাবা-মাকে বোঝাতো কিভাবে জুম্মান ধর্মের পথ থেকে দূরে চলে যাচ্ছে। “আপনাদের ছেলের দিকে তাকান! ও যখন আমার কাছে শিখছিল তখন কত ভাল ছেলে ছিল। আর এখন জিন্স, টি-শার্টের মতো বাজে পোশাক পরে ঘুরে বেড়ায়। সে পথভ্রষ্ট হয়েছে! এই ভালো ছেলেটাকে, এত সুন্দর ছেলেটাকে আমি কীভাবে জাহান্নামে পুড়তে দেব?” ইদ্রিস আবেগের সাথে জুম্মানের বাবা-মার কাছে আবেদন করেছিলেন। এদিকে ইদ্রিসের সেবাযত্ন করার জন্য জুম্মানকে প্রতি মাসে ১ হাজার টাকা দেওয়ারও প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। সেসময় জুম্মানের বাবার হাত ভেঙে গিয়েছিল, কাজ করতে পারছিল না। এর থেকে ভালো সুযোগ আর কী হতে পারে? জুম্মান তাই আবারও ইদ্রিসের হয়ে গেলো। তবে সবকিছু পালটে যায় ২০১৯’এর জুলাইয়ে। জুম্মানের চাচাতো ভাই অনেকদিন ধরেই লক্ষ্য করছিল তাকে। অবশেষে জানতে চায় জুম্মানের সমস্যাটা কী। দীর্ঘ নয় বছর পর এই প্রথম সব খুলে বলে জুম্মান। জুম্মান এসব কথা আর কাউকে বলতে মানা করলেও তার চাচাতো ভাই অত্যন্ত বুদ্ধির সাথে সকল তথ্য প্রমাণ যোগাড় করে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‍্যাব) কাছে নিয়ে যান। এর কয়েকদিন পর ২২ জুলাই র‍্যাবের হাতে গ্রেফতার হয় ৪২ বছর বয়সী ইদ্রিস। র‌্যাবের মুখপাত্র সুজয় সরকার বলেন, ইদ্রিস তার অপরাধের কথা স্বীকার করে দাবি করেছেন শয়তান তাকে দিয়ে এই কাজ করাতো। তিনি নিজেও শিশুকালে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে দাবি করেছেন। সহকারী পুলিশ সুপার সুজয় বলেন, এই ধরনের ঘটনাগুলো মোকাবেলা করা কঠিন। কারণ একজন আলেমের মতো সম্মানিত কেউ যৌন নির্যাতনকারী হতে পারে বলে বিশ্বাস করতে পারেন না অনুসারীরা। মাদ্রাসায় যৌন নির্যাতন অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের মতে, ২০২০ সালে মাদ্রাসায় ২৫জন ছেলে তাদের শিক্ষক, অধ্যক্ষ অথবা মাদ্রাসার সাথে যুক্ত অন্যান্য ব্যক্তির দ্বারা ধর্ষিত হয়েছে। ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ১৯ জন ছাত্র মাদ্রাসা শিক্ষক বা প্রধান শিক্ষকের দ্বারা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। তবে কয়েকটি সংবাদপত্রের সূত্রানুযায়ী এই সংখ্যা ৩৫এর উপরে। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের মতে, ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রায় ৬২৬ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। তবে বাংলাদেশের সমস্ত ধর্ষণ পরিসংখ্যানের মতোই প্রকৃত চিত্র এর বহুগুণ বেশি। কারণ বেশিরভাগ ঘটনাই কখনও রিপোর্ট করা হয় না। মাদ্রাসায় যৌন সহিংসতার শিকার আরেকজন সালেহ (ছদ্মনাম)। তিনি বলেন, মাদ্রাসায় ধর্ষণের অন্যতম বড় কারণ “বাচ্চাদের সুশিক্ষার অভাব”। ঝিনাইদহে মাদ্রাসায় থাকাকালীন সিনিয়ক এক ছাত্র তাকে মাত্র নয় বছর বয়সে ধর্ষণ করেছিল। তবু সালেহ কাওকে একথা জানাননি। তবে ওই ছাত্রই একা শিকারী ছিল না। মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষকের ভাগ্নেও সালেহকে একইভাবে নির্যাতন করেছিল। সবাই রাতে ঘুমিয়ে পড়লে সেই ব্যক্তি সালেহকে আস্তে করে ঘুম থেকে ডেকে তুলতো। "তিনি আমাকে দিয়ে তার যৌনাঙ্গ স্পর্শ করাতেন" সালেহ বলেন। একরাতে ওই শিক্ষক যখন সালেহকে দিয়ে এসব করাচ্ছিলেন তখন বাকি ছাত্ররা ঘুম থেকে উঠে সব কিছু দেখে ফেলে। কিন্তু আশ্চর্য বিষয় হচ্ছে একটা প্রতিবাদও উঠলো না, কেউ যেন কিছুই দেখেনি। একমাত্র ওই শিক্ষক নিঃশব্দে নিজের পোশাক ঠিক করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। তিনি আর ফিরে আসেননি। সালেহ বলেন, কোনো বিদ্যালয় আর মাদ্রাসায় ঘটা যৌন নির্যাতনের মধ্যে পার্থক্য হ'ল প্রথমটা প্রতিবাদে মুখর থাকে আর পরেরটায় থাকে ভয়। কথা বলার ফলাফল : স্নাতক অধ্যয়নরত সামাদ (ছদ্মনাম) সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে মাদ্রাসায় যৌন নির্যাতনের শিকার শিক্ষার্থীদের জন্য একটি অনলাইন আন্দোলন শুরু করেছিলেন। তিনি প্রাক্তন ও বর্তমান মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের বেনামে তাদের গল্পগুলো বলার আহ্বান জানান। আর তিনি যে সাড়া পান তা ছিল কল্পনার চেয়েও বেশি। কিন্তু গল্পগুলো শেয়ার দিয়ে আরও বিপদে পড়েন সামাদ। “সবাই আমাকে ব্লগার অভিজিৎ রায়ের সাথে তুলনা করছিলেন। কেউ কেউ আমাকে ইহুদী বলেও ডেকেছিল।" তাদের হুমকি স্পষ্ট ছিল। যৌন নির্যাতনকারীদের কী আদৌ শাস্তি দেওয়া হচ্ছে? ২০১৪ সালের ২৬ মে ধামরাইয়ের বায়তুল মামুর মসজিদের ইমাম কর্তৃক পঞ্চম শ্রেণির এক ছাত্রীকে ধর্ষণ করা হয়েছিল। অপরাধী সেলিম হোসেন কুরআন তেলাওয়াত শিখাতে এসে মেয়েটিকে মসজিদের পাশের বাড়িতে নিয়ে যায়। তিনি কেবল শিশুটিকেই ধর্ষণ করেননি, জামাল নামে তার সহযোগী ফোনে ভিডিওও ধারণ করেছিল, যা আশেপাশের সব মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। এক মাস পর সেলিম মেয়েটির বাবা-মার কাছে যেয়ে ভিডিওটি দেখিয়ে তার সাথে বিয়ে দেবার প্রস্তাব দেন। কথা-কাটাকাটির এক পর্যায়ে প্রতিবেশীরা ছুটে এসে সেলিমকে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। তাদের দু'জনকেই পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনে অভিযুক্ত করা হয়। আর সেলিমকে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের আওতায় অভিযুক্ত করা হয়। অপরাজেয় বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ওয়াহিদা বানু বলেন, মাদ্রাসা শিশুদের তাদের অধিকার সম্পর্কে আরও সচেতন করা উচিত। তিনি বলেন, “যখন কোনও মাদ্রাসায় কোনও শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হয়, প্রায়ই তারা বুঝতেই পারে না তাদের সাথে কী ঘটছে। তারা কথা বলতেও আতঙ্কিত থাকে। আমার মনে হয় প্রতিটি মাদ্রাসায় একটি ছাত্র সংগঠন থাকা উচিত যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের সমস্যাগুলো নিয়ে আলোচনা করতে পারে। শিক্ষার্থীদের পক্ষে বাবা-মা বা শিক্ষকদের চেয়ে নিজেদের মধ্যে কথা বলা সহজ।" “তবে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো জনগণের একটি ভুল ধারণা রয়েছে যে ইমাম ও মাদ্রাসা শিক্ষকদের মতো ধর্মীয় আলেমরা উচ্চ নৈতিক স্থানে বাস করেন। জনগণের সহায়তার কারণেই বেশিরভাগ সময়ে তারা রক্ষা পেয়ে যান।" মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শফিউদ্দিন আহমেদ বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে শিক্ষকদের নৈতিকতা শেখানোর জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, “কয়েকজন অনৈতিক ব্যক্তিই ছাত্রদের নির্যাতন করে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সর্বদা প্রস্তুত। তবে আমরা কেবল তাদের নৈতিকতা শেখানোর চেষ্টা করতে পারি। ” জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সায়েমা খাতুন বলেন, নির্যাতিত মাদ্রাসা শিশুদের নিয়ে পর্যাপ্ত গবেষণা নেই। তাদের পরিস্থিতি সম্পর্কে আরও ভাল বোঝার জন্য এবং বিষয়টি রোধ করার জন্য এ ধরণের যৌন নির্যাতনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের কৌশলগুলোর বিকাশ করা উচিত। তিনি বলেন, “এটি এমন একটি বিষয় যা নিয়ে আমরা এখনও কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি না। মাদ্রাসাগুলোতে যৌন নির্যাতনের বিষয়ে নীরবতা ভাঙাই সর্বপ্রথম দরকার।” সূত্র : ঢাকা ট্রিবিউন।