বস্তিবাসীদের জীবন সহজ করে তুলছে ডিজিটাল ঠিকানা

default

ঘিঞ্জি বস্তি এলাকায় মানুষের কঠিন জীবনযাত্রা অনেকেরই অজানা নয়৷ ভারতের মহারাষ্ট্র রাজ্যে এক অভিনব উদ্যোগের মাধ্যমে বস্তিবাসীদের ডিজিটাল ঠিকানা ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নতির চেষ্টা চলছে৷

ভারতের পশ্চিমে মহারাষ্ট্র রাজ্যে কোলহাপুর শহরে প্রায় দশ লাখ মানুষের বাস৷ অন্যান্য শহরের মতো সেখানেও অনেক মানুষ বস্তিতে থাকেন৷ সাধারণত নগর পরিকল্পনার আওতায় বাইরে ঘিঞ্জি এলাকা হয়ে ওঠে সেগুলি৷

কিছুদিন আগে পর্যন্তও সেখানে সঠিক দিকনির্ণয় করা অসম্ভব ছিল৷ এক হাজার ৭০০-রও বেশি পরিবার আইনত বৈধ এই বসতিতে বাস করলেও কারও নিজস্ব ঠিকানা নেই৷ অথচ আজ অর্ডার করে একেবারে দোরগোড়া পর্যন্ত পিৎসা পৌঁছে দেওয়া যাচ্ছে৷

অক্ষরেখা ও দ্রাঘিমা অনুযায়ী কোনো জায়গার অবস্থানের চিহ্ন হিসেবে গুগল প্লাস কোড ব্যবহার করে সেটা সম্ভব হচ্ছে৷ ভাগ্যশ্রী কল্যাণকরের মতো বস্তিবাসীর জন্য সেটা সত্যি আশীর্বাদের মতো৷ তিনি বলেন, ‘‘নিখুঁত লোকেশনের জন্য আমাকে এই কোড দেওয়া হয়েছে৷ আগে আমাদের বাসায় কোনো ডেলিভারির প্রয়োজন হলে অথবা কোনো আত্মীয় দেখা করতে এলে আমাদের ফোন করতে হতো৷ আমরা ফোনে রিকসা স্ট্যান্ড বা কাছের দোকানের নাম উল্লেখ করে পথের বর্ণনা দিতাম৷’’

প্রতিমা যোশী ও তার টিম এই প্লাস কোড তৈরির কাজ করেছেন৷ স্থপতি এবং ‘শেল্টার অ্যাসোশিয়েটস’ নামের এনজিও-র প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে তিনি বস্তি এলাকার পরিবেশের উন্নতির চেষ্টা করছেন৷

গুগলের সঙ্গে জোট বেঁধে তারা ডিজিটাল ঠিকানা সৃষ্টির উদ্যোগ নিয়েছেন৷ বস্তির ঠিক বাইরে বোর্ডের উপর ‘স্লাম ম্যাপ’ বসিয়েছেন৷ ‘শেল্টার অ্যাসোসিয়েটস’ সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা প্রতিমা যোশী বলেন, ‘‘প্রত্যেক বাড়ির জন্য এখানে আমরা লোকেশানাল অ্যাড্রেস দিচ্ছি৷ ফলে পরিস্থিতি এখন পুরো বদলে যেতে পারে কারণ সব বাড়ির ঠিকানা থাকবে৷ বস্তিতে কখনও সেটা হয় না৷’’

২৩০ কিলোমিটার দূরে পুণে শহরে এনজিও-র সদর দপ্তরে ডেটা অ্যানালিস্টদের এক টিম কাজ করে৷ তাঁরা জিআইএস ম্যাপিং নামের ভৌগোলিক তথ্য প্রণালী ব্যবহারে বেশ দক্ষ৷

প্রতিমার নেতৃত্বে তাঁরা স্যাটেলাইট ইমেজ ও ফিল্ড ম্যাপিং ব্যবহার করে যতটা সম্ভব নিখুঁত ডিজিটাল অ্যাড্রেস সৃষ্টি করেন৷ কোনো বস্তিতে সেই কাজ মোটেই সহজ নয়৷ প্রতিমা যোশী বলেন, ‘‘দেখলে একটি বাড়ি মনে হবে, কিন্তু সেখানে পৌঁছলে বুঝবেন আসলে একই ছাদের নীচে তিনটি ঠিকানা রয়েছে৷ ফলে শুধু স্যাটেলাইটের ছবি ব্যবহার করে বস্তি এলাকার ডিজিটাল পরিচয় তৈরি করা যায় না৷ সাক্ষাৎ উপস্থিত হয়ে ফিল্ড ম্যাপিং-এর কোনও বিকল্প নেই৷’’

এই স্থপতির মতে, একই কৌশল প্রয়োগ করে পাবলিক টয়লেট, ম্যানহোল, নিকাশি নেটওয়ার্ক, আবর্জনা ফেলার জায়গার মতো অবকাঠামোর মানচিত্রও সৃষ্টি করা হয়৷ সব তথ্য তাঁদের ওয়েবসাইটে রয়েছে৷ প্রতিমা মনে করেন, ‘‘দপ্তরে বসে প্রশাসনের কোনো কর্মীও এর সুবিধা পেতে পারেন৷ এই মানচিত্র খুললে এখনো পর্যন্ত বসানো সব নেটওয়ার্ক চোখে পড়বে৷ পানি বিভাগের প্রধান সব বসতির মানচিত্র খতিয়ে দেখে কোনো এলাকায় পানির সরবরাহ সম্পর্কে ধারণা পেতে পারেন৷ ফলে পরিকল্পনা করতে অনেক সুবিধা হয়৷”

প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিমার টিম স্যানিটেশন কর্মসূচিও এগিয়ে নিয়ে যেতে চায়৷ বেশিরভাগ বস্তির বাসিন্দারা শুধু পাবলিক টয়লেট ব্যবহার করতে পারেন৷ সেখানে পানির অভাব, দীর্ঘ অপেক্ষা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ বড় সমস্যা৷

প্রতিমা তাই বাড়ির মধ্যেই নিজস্ব টয়লেটের ব্যবস্থা করতে চান৷ কোলহাপুরের একটি বসতিতে তার টিম ম্যাপিং করতে গিয়ে খুব কম ড্রেন নেটওয়ার্কের সন্ধান পেয়েছেন৷ তথ্যের ভিত্তিতে শহরের নিকাশি ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত কয়েকটি পাইপের অবস্থান নিখুঁতভাবে শনাক্ত করেছেন তাঁরা৷ ফলে পৌর কর্তৃপক্ষ অনেক সহজে নতুন নর্দমার পাইপ বসাতে পারে৷

সারিকা চোপড়ে সম্প্রতি প্রথমবার বাসায় নিজস্ব টয়লেট পেয়েছেন৷ নিরাপত্তা ও গোপনীয়তার অনুভূতি পেয়ে তিনি অত্যন্ত খুশি৷ তিনি বলেন, ‘‘আমার কিশোরি মেয়ে আছে৷ বিশেষ করে রাতে বস্তির কমিইউনিটি টয়লেট ব্যবহার বিপজ্জনক ছিল৷ পুরুষরা আশেপাশে ঘোরাঘুরি করে আমাদের হয়রানি করতো৷ ড্রেন বসানো শুরু হওয়ার পর আমরা নিজেদের বাসায় টয়লেট তৈরির সিদ্ধান্ত নিলাম৷’’

কোলহাপুর শহর জুড়ে প্রতিমার টিম এখনো পর্যন্ত প্রায় ৩,৮০০ টয়লেট তৈরি করেছে৷ আধুনিক ম্যাপিং প্রযুক্তির কল্যাণে আরও নিরাপদ ও পরিষ্কার পরিবেশ সৃষ্টি সম্ভব হচ্ছে৷

সোনিয়া ফালনিকর/এসবি

ডয়েচে ভেলেতে সংবাদটি দেখুন : বস্তিবাসীদের জীবন সহজ করে তুলছে ডিজিটাল ঠিকানা

Leave A Reply

Your email address will not be published.