ছোট হয়ে আসছে দাকোপের মানচিত্র

পানখালী ইউপির পশ্চিমপাড়া, খলিশা, পানখালী ফেরিঘাট, খোনা, ও লক্ষ্মীখোলাসহ কয়েকটি গ্রামের বেড়িবাঁধে ভয়াবহ ভাঙন

‘সব সময়ই আতঙ্কে থাকতে হয় কখন কী হয়, এ ভয়ে। চারবার আমার ঘর ভেঙে চলে গেছে নদীতে। এখন নিঃস্বপ্রায়। এবার ভাঙলে ভূমিহীনে পরিণত হয়ে যাব। কোথাও যাওয়ার জায়গা থাকবে না। এখন এ বাঁধ মেরামত না করলে যেকোনো সময় ভেঙে শুধু আমার বাড়ি নয়, পুরো গ্রাম তলিয়ে যাবে নদীর পানিতে।’

খুলনার দাকোপ উপজেলার পানখালী ইউপির গৌতম রায় (৪৮) এভাবেই পশুর নদ ও ঝঁপঝঁপিয়া নদীর জরাজীর্ণ বেড়িবাঁধের বর্ণনা দেন।

জানা গেছে, পানখালী ইউপির পশ্চিমপাড়া, খলিশা, পানখালী ফেরিঘাট, খোনা, ও লক্ষ্মীখোলাসহ কয়েকটি গ্রামের বেড়িবাঁধে ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে। এসব এলাকার অধিকাংশ স্থানে বাঁধ ভেঙে আর ৩ থেকে ৪ ফুট অবশিষ্ট রয়েছে; যা জোয়ারের তোড়ে যেকোনো সময় ভেঙে গোটা ইউনিয়ন প্লাবিত হতে পারে। ভাঙন-আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে গোটা এলাকার মানুষ। এছাড়া ধস নেয়া খলিশা গ্রামের বেড়িবাঁধে পাশে রিংবাঁধ দিয়ে বালু ফেলা হচ্ছে।

জানা গেছে, পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) ৩১ নম্বর পোল্ডারের আওতায় ইউনিয়নটি। এর চারপাশে রয়েছে ঢাকি, মাঙ্গা, ঝঁপঝঁপিয়া ও পশুর নদ। এরমধ্যে গত বৃহস্পতিবার রাতে পশুর নদের জোয়ারের পানির তোড়ে খলিশা গ্রামের প্রায় ১০০ মিটার বাঁধে হঠাৎ ধস নামে। এর আগে ৬ অক্টোবর দুপুর ১২টার দিকে পশুর নদের জোয়ারের পানি অস্বাভাবিক বেড়ে পানখালী পূর্বপাড়া এলাকার ৩০ থেকে ৪০ মিটার বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি ঢুকে তলিয়ে যায়। গ্রামবাসী ভেঙে যাওয়া রিংবাঁধ স্বেচ্ছাশ্রমে সংস্কার করার দুই দফা চেষ্টা ব্যর্থ হয়। পরে অবশ্যই পাউবো’র চেষ্টায় সপ্তাহখানেক পর বাঁধ নির্মাণ করা হয়।

পানখালী ইউপি চেয়ারম্যান সাব্বির আহমেদ ভাঙন বেড়ে যাওয়ায় শঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, ইউপির অনেক এলাকা মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। দ্রুত নদী শাসনের উদ্যোগ নিয়ে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ না করতে পারলে তলিয়ে যাবে পুরো এলাকা।

পানখালী গ্রামের মো. হাসিব গাজী বলেন, আইলার পর ১১ বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হয়নি। বেড়িবাঁধ ভাঙলেই যেনতেনভাবে সংস্কার করা হয়। আর ভাঙন জায়গায় কোনোমতে পানি আটকানোর পর ঠিকাদাররা গাফিলতি করতে থাকে।

খলিশা গ্রামের বিধান দাসের প্রায় ৩ বিঘা জমি ছিল। ছিল বড় বাড়ি। তিনবারের ভাঙনে সব নদীতে বিলীন হয়ে যায়। বিধান বলেন, ভাঙনে সব বিলীন হওয়ায় এখন ১ শতাংশ ফসলের জমিও নেই। কোনোমতে একটা ঘর বানিয়ে বসবাস করছি, তা-ও ভয় পাচ্ছি ভাঙনে আবারও ঘরটি হারায় কিনা!

পানখালী ফেরিঘাট এলাকার বাসিন্দা ব্রজেন রায় বলেন, এলাকায় ভাঙন দেখা গেলে স্থানীয় নারী-পুরুষ সবাই মিলে স্বেচ্ছাশ্রমে মাটি দেয়। ইউপির চারপাশ দিয়ে ভাঙন দেখা দিয়েছে। এখনই সংস্কার না করলে এলাকা ত্যাগ করা ছাড়া উপায় থাকবে না।

দাকোপ উপজেলা সহকারি কমিশনার (ভূমি) গালিব মাহমুদ পাশা বললেন, নদী থেকে অপরিকল্পতিভাবে খননযন্ত্রের মাধ্যমে বালু তোলার কারণে নদী ভাঙন দেখা দেয়। এসব অবৈধ খননযন্ত্র উদ্ধার করে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জেল-জরিমানা করা হয়েছে।

ইউপি চেয়ারম্যান সাব্বির আহমেদ বলেন, গত ৬ অক্টোবর দুপুরে পানখালী গ্রামের বেড়িবাঁধ ভেঙে লোকালয় প্লাবিত হয়। এ সময় ১২০ হেক্টর আমন ধান তলিয়ে যায়। পানিবন্দী হয়েছিল তিন শতাধিক মানুষ। ইউপির চারপাশে নদী থাকায় ভাঙন লেগে আছে। এরই মধ্যে পাঁচটি গ্রামের বেড়িবাঁধে ভয়বাহ ভাঙন আতঙ্কে রয়েছে প্রায় ৪ হাজার মানুষ।

পানি উন্নয়ন বোর্ড খুলনার (বিভাগ-১) নির্বাহী প্রকৌশলী আশরাফুল আলম বলেন, পানখালী ইউপির ১৫ টি স্থান ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। তবে যেখানে ভাঙন দেখা দিচ্ছে, সেখানে বিকল্প রাস্তা হিসেবে রিংবাঁধ দেওয়া হচ্ছে। খলিশার ধসের জায়াগায় কাজ চলছে। ভাঙন রোধে টেকসই বাঁধের জন্য একটি প্রকল্পের প্রস্তাবনা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো আছে। ৪ নভেম্বর ওটা নিয়ে সভা হবে। প্রকল্প অনুমোদন হলেই ওই এলাকায় টেকসই বাঁধের কাজ শুরু করা হবে।

নিউজ সোর্স : ছোট হয়ে আসছে দাকোপের মানচিত্র

Leave A Reply

Your email address will not be published.