আধিপত্য বিস্তার-পদ বাণিজ্যের দ্বন্দ্বে বগুড়া বিএনপিতে ফাটল

বগুড়া জেলার মানচিত্র: ফাইল ফটো

দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতায় নেই বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি। অথচ দলটির নেতাদের দ্বন্দ্ব বেড়েই চলেছে বগুড়ার রাজনীতির মাঠে। পদ বাণিজ্য, আধিপত্য বিস্তারসহ বিভিন্ন কারণে বগুড়া বিএনপিতে ধরেছে ফাটল।

গত বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর বগুড়া জেলা বিএনপির সাবেক প্রচার সম্পাদক ও জেলা যুবদলের সাবেক সভাপতি সিপার আল বখতিয়ারকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বগুড়া জেলা বিএনপির দলীয় কার্যালয় দখল নিয়ে শুরু হয় হট্টগোল। এরপর ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও ঝাড়ু মিছিল হয়। এমনকি দলীয় কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে দেয়ার ঘটনাও ঘটে। তবে বগুড়া বিএনপিতে দলীয় কার্যালয়ে তালা ঝুলানোর ঘটনা এটিই নতুন নয়। এর আগেও এমন ঘটনা ঘটে গত বছরের ২৫ এপ্রিল।

এদিকে জেলা বিএনপির বর্তমান আহ্বায়ক কমিটির ওপর অভিযোগ তুলে দলীয় নেতারা বলছেন, জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি গঠনের পর গত দেড় বছরে ২৩ জন নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। আহ্বায়ক কমিটি নেতাদের মূল্যায়ন না করে ষড়যন্ত্র করে কেন্দ্রীয় নেতাদের ভুল বুঝিয়ে একের পর এক বহিষ্কার করছেন।

জেলা বিএনপির দলীয় কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০১২ সালের জানুয়ারিতে জেলা বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটি তিন বছরের জন্য গঠন করা হয়েছিল। এতে ভিপি সাইফুল ইসলামকে সভাপতি ও জয়নাল আবেদীন চাঁনকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছিল। কমিটি তিন বছরের জন্য গঠন করা হলেও তারা সাত বছর একতরফা নেতৃত্ব দেন।

২০১৯ সালের ২৫ এপ্রিল জেলা নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় ও কমিটি নিয়ে কথা বলতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে বগুড়ার নেতাদের তলব করা হয়। সেখানে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশ উল্লেখ করে ১০ দিনের মধ্যে জেলার আহ্বায়ক কমিটি গঠন করতে বলা হয়। এ সিদ্ধান্তের পর পরই নেতাদের একাংশ তীব্র প্রতিবাদ জানান। কেন্দ্রীয় নেতাদের সামনে তারা এ সিদ্ধান্তের বিপক্ষে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। এদিকে ২৫ এপ্রিল রাতেই জেলা বিএনপির দলীয় কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে দেয় বিএনপির একাংশ।

পরে জেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক পরিমল চন্দ্র দাস ও প্রকাশনা সম্পাদক শাহ মেহেদী হাসান হিমুকে দলীয় পদ ও সদস্য পদ থেকে অব্যাহতি দিয়ে চিঠি পাঠানো হয়।

সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে ২০১৯ সালের মে মাসের মাঝামাঝিতে বগুড়া জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়।

বগুড়া-৬ আসনের এমপি গোলাম মোহাম্মদ সিরাজকে আহ্বায়ক ও অ্যাডভোকেটস বার সমিতির সেক্রেটারি সাইফুল ইসলাম এবং সাবেক সহ-সভাপতি ফজলুল বারী তালুকদার বেলালকে যুগ্ম-আহ্বায়ক করে ৩১ সদস্য বিশিষ্ট ওই কমিটি ঘোষণা করা হয়।

তবে, এই কমিটি নিয়ে নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা তখন থেকে শুরু হয়ে এখনও পর্যন্ত চলছেই।

অনেক নেতাকর্মী অভিযোগ করেন, বগুড়ায় বিএনপির রাজনীতিতে যাদের অবদান নেই তাদের দিয়েই আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়েছে। তবে কেউ এ ব্যাপারে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হচ্ছেন না।

দলীয় সূত্রে জানা যায়, বগুড়ায় বিএনপির রাজনীতি বর্তমানে মূলত দুই ভাগে বিভক্ত। এর একদিকে রয়েছেন বিএনপির চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা সাবেক এমপি হেলালুজ্জামান তালুকদার লালু আর অন্য দিকে রয়েছেন জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ভিপি সাইফুল ইসলাম। তবে বগুড়ার শাজাহানপুর ও গাবতলি উপজেলাতে এখন দেখা যাচ্ছে সাবেক এমপি হেলালুজ্জামান তালুকদার লালু ও জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য মোরশেদ মিল্টনের গ্রুপিং। এ বিষয়টি এখন প্রকাশ্যে চলে এসেছে। জেলায় গ্রুপিংয়ের কারণে দলীয় কর্মসূচিগুলোতে নেতাকর্মীদের উপস্থিতি কমে গেছে। সবাই বিচ্ছিন্নভাবে কর্মসূচি পালন করেন।

বিএনপির সমর্থকরা বলেন, জেলা বিএনপির গ্রুপিংয়ের কারণে তারা বিপাকে পড়েছেন। দলটির সামনের দিনগুলো নিয়ে তারা উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় রয়েছেন। এভাবে চলতে থাকলে জেলা বিএনপি বড় ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হবে।

এদিকে জেলা যুবদলের আহ্বায়ক কমিটির  বিরুদ্ধে উঠেছে পদ বাণিজ্যের অভিযোগ।

দলীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালের ৫ আগস্ট জেলা যুবদলের আহ্বায়ক কমিটির অনুমোদন দেয়া হয়। কমিটিতে খাদেমুল ইসলাম খাদেমকে আহ্বায়ক ও জাহাঙ্গীর আলমকে যুগ্ম আহ্বায়ক করা হয়। কেন্দ্রীয় যুবদলের সভাপতি সাইফুল ইসলাম নীরব ও সাধারণ সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকু এই কমিটির অনুমোদন দেন।

যুবদল নেতাদের অভিযোগ, আহ্বায়ক কমিটিকে ৯০ দিনের মধ্যে সব ইউনিট কমিটি গঠন করে জেলা সম্মেলন করার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। কিন্তু এ নির্দেশ অমান্য করেছে আহ্বায়ক কমিটি। তিন বছর অতিবাহিত হলেও করা হচ্ছে না জেলা যুবদলের সম্মেলন। জেলা যুবদলের আহ্বায়ক খাদেম ও যুগ্ম আহ্বায়ক জাহাঙ্গীর শুরু করেছেন পদ বাণিজ্য। টাকার বিনিময়ে জেলায় ইউনিট কমিটি গঠন করছেন তারা।

জেলার শিবগঞ্জ উপজেলা যুবদলের সাবেক সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন হাফিজুর রহমান হিরু। তিনি উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক পদপ্রার্থী ছিলেন। তার কাছ থেকে কয়েক দফায় পদ দেয়াসহ বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে সাত লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন জেলা যুবদলের আহ্বায়ক খাদেমুল ইসলাম। টাকা নিয়েও তাকে আহ্বায়কের পদ দেননি খাদেমুল।

যুবদল নেতা হিরু বলেন, আহ্বায়ক খাদেমুল টাকা ছাড়া কাউকে পদ দেননি। আমার কাছ থেকে কয়েক দফায় প্রায় সাত লাখ টাকা নিয়েছেন তিনি। কখনো নিজে আবার কখনো অন্যের মাধ্যমে তার কাছে টাকা পৌঁছে দিয়েছি। টাকা নিয়েও তিনি আমাকে পদ দেননি। খাদেমুল আমার সঙ্গে প্রতারণা করে আরেকজনের কাছ থেকে টাকা নিয়ে তাকে আহ্বায়কের পদ দিয়েছেন। খাদেমুলরা পদ বাণিজ্য করতেই রাজনীতিতে এসেছেন।

নিউজ সোর্স : আধিপত্য বিস্তার-পদ বাণিজ্যের দ্বন্দ্বে বগুড়া বিএনপিতে ফাটল

Leave A Reply

Your email address will not be published.