হরতাল ডেকে দিনব্যাপি হেফাজতের তাণ্ডব

- Advertisement -

নিউজ ডেস্ক: শান্তিপূর্ণ হরতালের ডাক দিয়ে দেশের কয়েকটি জেলায় রীতিমতো তাণ্ডব চালানো হয়েছে। ব্যাপক ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। বন্ধ হয়ে গেছে কয়েকটি জেলার রেল যোগাযোগ। টার্গেট করা হয়েছে সংবাদমাধ্যমের গাড়িও। বাদ পড়েনি প্রেসক্লাব, জেলা প্রশাসকের কার্যলয়সহ বিভিন্ন সরকারি স্থাপনা ও মন্দির।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় রবিবার সকাল থেকে বেছে বেছে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে আধুনিক সব স্থাপনায়। শহরের রেল স্টেশন, সিভিল সার্জন অফিস, পুলিশ সুপারের বাসভানসহ সরকারি-বেসরকারি অর্ধশতাধিক প্রতিষ্ঠান, দু’টি মন্দির, আওয়ামী লীগ নেতাদের বাড়িসহ বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। শহরজুড়ে সর্বত্র এখন ধ্বংসযজ্ঞের চিহ্ন। পোড়া গন্ধ চারদিকে।

সকালে ঢাকা থেকে ছেড়ে যাওয়া চট্টগ্রামগামী সোনার বাংলা এক্সপ্রেস ব্রাহ্মণবাড়িয়া স্টেশনের কাছাকাছি পৌঁছালে ট্রেনের ইঞ্জিন ও কয়েকটি কোচের কাচ ভাঙচুর করা হয়। ট্রেন যেন চলাচল করতে না পারে, সে জন্য ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলস্টেশনে আশপাশের রেলগেটের ব্যারিকেড বাঁকা করে ফেলা হয়েছে। রেললাইনের ক্ল্যাম খুলে ফেলা হয়েছে।

ঘটনার এখানেই শেষ নয়, ভাঙচুর চালানো হয় রেল স্টেশনে। সেখানকার কম্পিউটারসহ আধুনিক সব যন্ত্রপাতি ভেঙে তাতে আগুন ধরিয়ে দেয় বিক্ষোভকারীরা। এতে সব পুড়ে ছাই হয়ে যায়। ঘটনার ভয়াবহতায় ঢাকার সাথে চট্টগ্রাম ও সিলেটের ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। রেলের পর সড়ক পথে যোগাযোগ বন্ধ করতে জেলার প্রবেশমুখ আশুগঞ্জ সৈয়দ নজরুল ইসলাম সেতুর টোল প্লাজায় থাকা পুলিশ ফাঁড়িতে হামলা করে বিক্ষোভকারীরা। এ সময় পুলিশ ফাঁড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। একইসঙ্গে টোল প্লাজায় ভাঙচুর চালিয়ে টোল নেওয়া বন্ধ করে দেয় হেফাজতের সমর্থকরা।

বেলা ১১টার পর আগুন দেওয়া হয় জেলা পরিষদ ভবনে। সুরসম্রাট আলাউদ্দিন সংগীতাঙ্গন, পৌরসভা ভবন ও সদর উপজেলা ভূমি কার্যালয় ভাঙচুর ও আগুন দেওয়া হয়। এরপর জেলা প্রশাসকের বাসভবন, জেলা জজের বাসভবন এবং পুলিশ সুপারের বাসভবনেও আগুন দেয় হেফাজতের কর্মীরা। বাদ যায়নি করোনা প্রতিরোধে ভ্যাকসিন প্রদান করা সেই সিভিল সার্জন অফিসও।

বেলা ১২টার দিকে সরাইল বিশ্বরোড মোড়ে খাটিহাতা হাইওয়ে থানায় হামলা করেন হরতাল সমর্থনকারীরা। তারা থানায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেন। এ সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা গুলি চালায়। পরে সেখান থেকে দুজনের লাশ উদ্ধার করা হয়।

এদিকে হামলার ঘটনা ঘটেছে জেলার প্রেসক্লাবেও। এ সময় প্রেসক্লাবের সভাপতি ও দৈনিক জনকণ্ঠের নিজস্ব প্রতিবেদক রিয়াজউদ্দিন জামি মাথায় আঘাত পান। পরে তাকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। হামলা চালানো হয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া বিশ্ববিদ্যালয়েও।

এসব ঘটনা সামাল দিতে সকাল থেকেই বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও আত্মরক্ষায় পুলিশ গুলি চালায় ও টিয়ার শেল ছুড়ে। বিকেল পর্যন্ত জেলায় তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। আর আহত হয়ে জেলার ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালে অন্তত ২৭ জন চিকিৎসা নিয়েছেন।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া গত তিনদিনে সংঘর্ষে এখন পর্যন্ত নয়জন মারা গেছেন। এর মধ্যে শুক্রবার একজন ও শনিবার পাঁচজন মারা যান। শনিবার সদর থানায় দায়ের হওয়া পৃথক তিন মামলা সাড়ে ছয় হাজার অজ্ঞাত লোককে আসামি করা হয়েছে।

এদিকে এসব বিষয়ে পুলিশের কোনো দায়িত্বশীল সূত্র কথা বলতে চায়নি। তবে, সদর থানায় দায়ের করা তিনটি মামলায় ১৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। কিন্তু আজকের ঘটনায় এখনও কোনো মামলা হয়নি বলে জানান জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা।

এদিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মতো ঘটনা বন্ধ না হলে কঠোর ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। আর তথ্যমন্ত্রী ডক্টর হাছান মাহমুদ বলেছেন, যারা একাত্তরে স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছে, তারাই এখন নৈরাজ্য সৃষ্টি করছে। সংবাদ সম্মেলনে দেয়া এ প্রতিশ্রুতিতে থাকেননি মাওলানা মামুনুলের সংগঠন হেফাজতে ইসলামের কিছু নেতাকর্মী।

এক ব্রিফিংয়ে তথ্যমন্ত্রী বলেন, যারা গত কয়েকদিন ধরে আন্দোলনের নামে নৈরাজ্য করছে, তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য আছে। মন্ত্রী বলেন, একাত্তর সালে যারা আমাদের স্বাধীনতার সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে পাকিস্তানকে সহযোগিতা করেছিল, আজকে যারা বাসে আগুন দিয়েছে। তাদেরকে নেতৃত্ব দিচ্ছে তারাই যারা একাত্তর সালে আমাদের মা-বোনদের নির্যাতন করেছিল, গণহত্যায় অংশগ্রহণ করেছিল তাদেরই পরবর্তী প্রজন্ম।

দেশে কয়েক লাখ কওমী মাদ্রাসা থাকলেও কিছুসংখ্যক মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা অংশ নেয় তাণ্ডবে। অপরদিকে রাজধানীসহ দেশের কয়েকটি জেলায় ব্যাপক ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। নারায়ণগঞ্জে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সাইনবোর্ড এলাকায় ট্রাক, বাস, প্রাইভেটকারে ভাঙচুরের সময় বাদ যায়নি গণমাধ্যমের গাড়িও।

এদিকে এসব বিষয়ে পুলিশের কোনো দায়িত্বশীল সূত্র কথা বলতে চায়নি। তবে, সদর থানায় দায়ের করা তিনটি মামলায় ১৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। কিন্তু আজকের ঘটনায় এখনো কোনো মামলা হয়নি বলে জানান জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা।

নারায়ণগঞ্জ: হেফাজতে ইসলামের ডাকা হরতালের পরই নারায়ণগঞ্জে ১০টি যানবাহনে আগুন দিয়েছে সংগঠনটির কর্মীরা। রোববার সন্ধ্যা সোয়া ছয়টার দিকে শিমরাইলের মাদানীনগর মাদ্রাসার সামনে মহাসড়কে একটি বাস, চারটি ট্রাক এবং চারটি কার্ভাডভ্যানসহ মোট ১০টি গাড়িতে আগুন দেয়া হয়।

জানা যায়, কর্মী নিহতের প্রতিবাদে সকাল থেকে হেফাজতে ইসলামের হরতাল চলে। বিকাল পাঁচটার পর থেকে নারায়ণগঞ্জ পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবিসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বিক্ষোভকারীদের সড়ক থেকে সরিয়ে দেয়। পরে ঢাকামুখী যানবাহন চলাচল শুরু হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা চলে গেলে তারা আবারও জড়ো হয়ে যানবাহনকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছুড়তে শুরু করে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ধাওয়া দিয়ে তারা সরে যায়। ধাওয়া, পাল্টা ধাওয়ার এক পর্যায়ে একটি বিআরটিসি বাসে আগুন ধরিয়ে দেয় বিক্ষোভকারীরা। একেক করে ট্রাক, কভার্ডভ্যানসহ অন্তত ১০টি যানবাহনে আগুন ধরিয়ে দেয়।’

নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাহিদা বারিক বলেন, সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ১০ থেকে ১২টি গাড়িতে আগুন দিয়েছে বিক্ষোভকারীরা। এছাড়াও অনেক গাড়ি ভাঙচুর করেছে। হরতাল সমর্থনে এখনও মহাসড়কে বিক্ষোভ করছে হেফাজত ইসলামের নেতাকর্মীরা। আগুন দেয়ার পর পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।

চট্টগ্রাম: দুপুর পর্যন্ত চট্টগ্রামের হাটহাজারী-খাগড়াছড়ি সড়কে যান চলাচল বন্ধ ছিলো। গত শনিবার রাতে নতুন করে সড়কের দুটি স্থান খুঁড়ে ফেলা হয়েছে। এ ছাড়া সড়কের ওপর ইটের স্তূপ দিয়ে তৈরি দেয়াল এখনো রয়েছে। রোববার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ওই এলাকায় মাদ্রাসার ছাত্রদের জড়ো হতে দেখা গেছে।

তবে হেফাজত ইসলামের হরতালের মধ্যেও হাটহাজারী উপজেলার ভেতরের সড়কগুলোয় যান চলাচল স্বাভাবিক ছিলো। তবে রাস্তায় ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা কম। ভোরে হাটহাজারী-রাঙামাটি সড়কের ইছাপুরে হেফাজত ইসলামের কর্মীরা ব্যারিকেড দিলেও পুলিশ ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা তা তুলে দেন।

গত শুক্রবার বেলা আড়াইটা থেকে বন্ধ রয়েছে হাটহাজারী-খাগড়াছড়ি সড়ক। সড়কের হাটহাজারী বাজার এলাকায় ইটের স্তূপ দিয়ে পাঁচ ফুট দেয়াল দিয়ে রাখা হয়েছে। পাশাপাশি উপজেলা ভূমি অফিসের সামনের সড়ক খুঁড়ে ফেলা হয়েছে। সড়কে আড়াআড়িভাবে রাখা হয়েছে সিমেন্টের ইলেকট্রিক পিলার। শনিবার রাতে সড়কটির কাচারী রোডের মুখে দুটি অংশ খুঁড়ে ফেলা হয়েছে। কাচারী রোডের মুখে বাঁশের ব্যারিকেডটি এখনো রয়েছে। রিকশাসহ কোনো গাড়ি চলাচল করতে পারছে না।

সড়কটি বন্ধ থাকায় দুর্ভোগে পড়েছে যাত্রীরা। দুপাশে আটকা রয়েছে মালবাহী ট্রাক। বিকল্প সড়ক দিয়ে লোকজনকে গন্তব্যে পৌঁছাতে হচ্ছে। এতে দ্বিগুণ ভাড়া ও সময় লাগছে বেশি। বেশি ভোগান্তিতে পড়তে দেখা গেছে নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের। ওই এলাকায় দোকানপাট বন্ধ রয়েছে। সেখানে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। অতিরিক্ত আড়াই শ র‍্যাব, পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। এ ছাড়া বিজিবির ১০০ সদস্য মোতায়েন রয়েছেন। তারা বিভিন্ন জায়গায় টহল দিচ্ছেন।

এবিষয়ে হাটহাজারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুহুল আমিন বলেন, হাটহাজারীতে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। যানবাহন চলাচল সকালে কম থাকলেও আস্তে আস্তে বাড়ছে। হাটহাজারী-খাগড়াছড়ি সড়ক বন্ধ থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি। আস্তে আস্তে সড়কটি সচল করার চেষ্টা চলছে।

সিলেট: হেফাজতে হরতাল চলাকালে দুপুরে নগরীর বন্দরবাজার এলাকায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পরে বিজিবি ও পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে যুবলীগ ও ছাত্রলীগের কর্মীরা বন্দরবাজার এলাকায় অবস্থান করা হরতাল সমর্থকদের ধাওয়া করে। এ সময় উভয় পক্ষের মধ্যে ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। পরে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে। এরপরে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে হরতাল সমর্থকদের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া হয়। এ ঘটনার পর নগরীর বন্দরবাজার এলাকায় বিজিবি ও পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

মুন্সীগঞ্জ: মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার কেয়াইন ইউনিয়নের শিকারপুর সড়কে পুলিশ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগ নেতা কর্মীদের সাথে হেফাজত ইসলামের নেতা কর্মীদের সংঘর্ষ, থানার ওসি এসএম জালাল উদ্দীন ও হেফাজত ইসলামী কেন্দ্রীয় কমিটির নায়েবে আমির আব্দুল হামিদ মধুপুরীসহ কমপক্ষে ৫০ জন আহত হয়েছে। এই ঘটনায় ইট পাটকেল ছুঁড়া, টিয়ারসেল নিক্ষেপ ও রাবার বুলেট ছুঁড়া হয়। দুটি মোটর সাইকেলে আগুন, দুটি বাড়ি ভাঙচুর এবং দুটি বাড়িতেও অগ্নিসংযোগ করা হয়।

সিরাজদিখান থানার তদন্ত ওসি মো. কামরুজ্জামান জানান, রোববার দুপুরে হরতালে পিকেটিং করতে হেফাজত নেতা আব্দুল হামিদ মধুপুরীর নেতৃত্বে পাঁচ শতাধিক নেতা কর্মী লাঠি সোটা নিয়ে নিমতলা এক্সপ্রেসওয়েতে এসে অবরোধ করে। তাদের রাস্তা ছেড়ে দিতে বললে, হামলা চালায় হরতাল সমর্থকরা। এ সময় ইটপাটকেল ও লাঠি চার্জ হলে, টিয়ারসেল ও রাবার বুলেট ছুঁড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে তারা।

এই ঘটনায় থানার ওসিসহ সাতজন পুলিশ ও হেফাজত নেতা কর্মী ছাত্রলীগ ও যুবলীগের কমপক্ষে ৫০ জন আহত হয়। সড়ক ছেড়ে রাজানগর গিয়ে ঐ ইউনিয়নের আওয়ামী লীগ সভাপতি আলমগীর কবিরের বাড়ি এবং ইউনিয়ন ছাত্রলীগের আহ্বায়ক আসেল খানের বাড়ি দুটিতে অগ্নিসংযোগ করা হয় বলে দাবি করেন আলমগীর ও আসেল খাঁন।

এ সময় আলমগীর কবিরের মা ও বড় ভাইকে পিটিয়ে আহত করা হয় বলেও আলমগীর জানান। হেফাজত ইসলামের নেতাদের দাবি, তাদের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে পুলিশ ও সরকার দলীয় সন্ত্রাসীরা তাদের ওপর হামলা চালিয়ে তাদের পির সাহেবসহ শতাধিক নেতাকর্মী আহত করে।

কিশোরগঞ্জ: কিশোরগঞ্জে হেফাজতে ইসলামের ডাকা হরতাল চলাকালে আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। হেফাজত ও আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের মধ্যে দফায় দফায় হওয়া ওই সংঘর্ষে উভয় পক্ষের ৫০ জন আহত হয়েছেন।

সংঘর্ষে আহত ব্যক্তিদের মধ্যে চারজনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তাঁরা হলেন জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আমিনুল ইসলাম, জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি আনোয়ার হোসেন, সাধারণ সম্পাদক ফয়েজ ওমান ও হেফাজত নেতা কিশোরগঞ্জ ইমাম উলামা পরিষদের প্রচার সম্পাদক মাওলানা কে এম নাজিমুদ্দিন।

প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্র জানায়, দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে হেফাজতে ইসলামের নেতা-কর্মীসহ কয়েক শ হরতাল সমর্থনকারী লাঠিসোঁটা নিয়ে জেলা শহরের স্টেশন রোডে জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে হামলা চালান। এ সময় তারা ওই কার্যালয়ের সাইনবোর্ড ও ভেতরের আসবাব ব্যাপক ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেন। প্রায় ১৫-২০ মিনিট ধরে ভাঙচুর করার পর আওয়ামী লীগের কিছু নেতা-কর্মী কার্যালয়ে এসে বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সভা করেন।

প্রত্যক্ষদর্শী সূত্র আরও জানায়, হরতাল চলাকালে কিশোরগঞ্জ জেলা শহরের স্টেশন রোডের গৌরাঙ্গবাজার, শহীদি মসজিদ প্রাঙ্গণ, পুরান থানা, একরামপুর, আওয়ামী লীগ কার্যালয় ও আঠারো বাড়ি কাচারি মোড়ে দফায় দফায় আওয়ামী লীগ ও হেফাজতের নেতা-কর্মীদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও সংঘর্ষ হয়। দুপুর ১২টায় শুরু হয়ে প্রায় বেলা আড়াইটা পর্যন্ত এ সংঘর্ষ চলে।

সংঘর্ষে জেলা আওয়ামী লীগের নেতা আমিনুল ইসলাম, জেলা ছাত্রলীগ নেতা আনোয়ার হোসেন, ফয়েজ ওমান ও হেফাজত নেতা কে এম নাজিমুদ্দিন, আল জামিয়াতুল ইমদাদিয়া মাদ্রাসার কয়েকজন ছাত্রসহ প্রায় ৫০ জন আহত হয়েছেন।

সংঘর্ষ থামাতে পুলিশ অসংখ্য কাঁদানে গ্যাসের শেল, ফাঁকা গুলি ও রাবার বুলেট ছোড়ে। সংঘর্ষে জেলা আওয়ামী লীগের নেতা আমিনুল ইসলাম, জেলা ছাত্রলীগ নেতা আনোয়ার হোসেন, ফয়েজ ওমান ও হেফাজত নেতা কে এম নাজিমুদ্দিন, আল জামিয়াতুল ইমদাদিয়া মাদ্রাসার কয়েকজন ছাত্রসহ প্রায় ৫০ জন আহত হয়েছেন।

হরতাল চলাকালে কিশোরগঞ্জ থেকে দূরপাল্লার যান চলাচল কম ছিল। এ ছাড়া সংঘর্ষের কারণে জেলা শহরের স্টেশন রোড এলাকায় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও যান চলাচল বন্ধ থাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

কিশোরগঞ্জ ইমাম উলামা পরিষদের সভাপতি ও হেফাজত নেতা মাওলানা শফিকুর রহমান জালালাবাদী বলেন, তাঁরা শান্তিপূর্ণ হরতাল পালন করতে চেয়েছিলেন। কোনো সংঘর্ষের পক্ষে ছিলেন না। এমনকি সংঘর্ষ চলাকালে তিনি শহীদি মসজিদের মাইকে বারবার হেফাজত কর্মীসহ মাদ্রাসাছাত্রদের সড়ক ছেড়ে নিজ নিজ কাজে ফিরে যেতে আহ্বান জানিয়েছেন।

কিশোরগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এম এ আফজল বলেন, হরতালের নামে জঙ্গি বাহিনী ন্যক্কারজনকভাবে আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে ব্যাপক হামলা ও ভাঙচুর চালিয়ে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে।

পুলিশ সুপার মো. মাশরুকুর রহমান বলেন, পরিস্থিতি শান্ত রাখতে পুলিশ, বিজিবি, র‌্যাবসহ বিপুলসংখ্যক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যাপক উপস্থিতির কারণেই বড় ধরনের কোনো সহিংসতা ঘটেনি। তবে সংঘর্ষ থামাতে পুলিশ কিছু কাঁদানে গ্যাসের শেল ও ফাঁকা গুলি ছুড়েছে। পুলিশ সুপার আরও জানান, আওয়ামী লীগের কার্যালয় ভাঙচুরসহ সব ঘটনার আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে এবং যারা এ অস্থিতিশীল পরিস্থিতির জন্য দায়ী তাদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা হবে।

অন্যদিকে দেশে হেফাজতে ইসলামের চলা নৈরাজ্য বন্ধে কঠোর হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সেই সাথে এ জাতীয় ক্ষয়ক্ষতিসহ সকল প্রকার উচ্ছৃঙ্খল আচরণ বন্ধ করার জন্য সংশ্লিষ্ট সকলকে আহ্বান জানানো হয়েছে।

রোববার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা (সিনিয়র তথ্য অফিসার) মো. শরীফ মাহমুদ অপু স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ আহ্বান জানানো হয়। এতে বলা হয়, গত দুইদিন ধরে কতিপয় উচ্ছৃঙ্খল ব্যক্তি ও গোষ্ঠী ধর্মীয় উন্মাদনায় চট্টগ্রাম জেলার হাটহাজারী উপজেলা এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর, সরাইল ও আশুগঞ্জ উপজেলার সরকারি সম্পত্তি ধ্বংস করছে। যার মধ্যে উপজেলা পরিষদ, থানা ভবন, সরকারি ভূমি অফিস, পুলিশ ফাঁড়ি, রেল স্টেশন, রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের বাড়িঘর, প্রেসক্লাবসহ জানমালের ক্ষয়ক্ষতি করা হচ্ছে।

এ জাতীয় ক্ষয়ক্ষতিসহ সকল প্রকার উচ্ছৃঙ্খল আচরণ বন্ধ করার জন্য সংশ্লিষ্ট সকলকে আহ্বান জানানো হচ্ছে। অন্যথায় জনগণের জানমাল ও সম্পদ রক্ষার্থে সরকার কঠোর অবস্থান গ্রহণ করবে। বিজ্ঞপ্তিতে আরও জানানো হয়েছে, সরকার আরও উদ্বেগের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে যে, স্বার্থান্বেষী মহল এতিম ছাত্র ও শিশুদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে রাস্তায় নামিয়ে সরকারি সম্পত্তিসহ জনগণের সম্পদ ও রাজনৈতিক, নেতৃবৃন্দের ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগসহ নানা ধরণের অপকর্মে নিয়োজিত করায় প্রাণহানির মতো ঘটনা ঘটছে। তাছাড়াও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অসত্য, গুজব ছড়িয়ে উত্তেজনা সৃষ্টি করা হচ্ছে। এসব গুজব রটনাকারীসহ আইন অমান্য করে শান্তি-শৃঙ্খলা ভঙ্গ এবং নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে।

Print Friendly, PDF & Email

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

Leave A Reply

Your email address will not be published.