রাজশাহীতে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ১৭ জনের বাড়ি রংপুরের পীরগঞ্জে

- Advertisement -

রংপুরের পীরগঞ্জ থেকে মাইক্রোবাসে রাজশাহীতে ভাইয়ের বাসায় বেড়াতে আসছিলেন নাজমা বেগম (২৭)। তার সঙ্গে ছিলেন স্বামী, তিন সন্তানসহ এলাকার আরও তিনটি পরিবারের সদস্যরা। দুপুর ১টার দিকে তাদের মাইক্রোবাসটি নাটোরে এলে নাজমা তার ভাই রাজশাহীতে সেনাবাহিনীতে কর্মরত সার্জেন্ট নুর মোহাম্মদকে কল দেন।

তিনি জানান, সবাই তার বাসায় দুপুরের খাবার খাবেন। এর পর রাজশাহীতে তারা বেড়াবেন। যাবেন হজরত শাহমখদুমের মাজারেও। সার্জেন্ট নুর মোহাম্মদ বোন-ভাগ্নিদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। কিন্তু তাদের সঙ্গে তার আর দেখা হলো না। কিছুক্ষণ পরই জানতে পারেন, কাটাখালীতে সড়ক দুর্ঘটনায় বোনের পরিবারের পাঁচ সদস্যসহ মারা গেছেন ১৭ জন।

এদিকে রংপুরের পীরগঞ্জের পাঁচটি গ্রামের চারটি পরিবারের ১৭ সদস্যের মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। কান্নার রোল চারদিকের পরিবেশকে ভারি করে তুলেছে। পীরগঞ্জ থানার ওসি সরেস চন্দ্র বলেন, পীরগঞ্জ থেকে ছেড়ে যাওয়া মাইক্রোবাসে চারটি পরিবারের ১৬ জনসহ ১৮ জন ছিলেন। শুনেছি তাদের মধ্যে ১৭ জনই মারা গেছেন।

শুক্রবার দুপুর ২টা ১০ মিনিটে রাজশাহীর কাটাখালীতে ভয়াবহ এ দুর্ঘটনা ঘটে। বেপরোয়া গতিতে আসা ঢাকাগামী হানিফ পরিবহনের সঙ্গে তাদের মাইক্রোবাসটির মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। মাইক্রোবাসটিকে দুমড়েমুচড়ে অন্তত ২০ গজ দূরে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটি লেগুনার সঙ্গে নিয়ে ধাক্কা লাগায়। এ সময় মাইক্রোবাসের ভেতরে থাকা গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ম্ফোরণ হয়ে আগুন ধরে যায়। গাড়িতেই দগ্ধ হয়ে মারা যান ১১ জন। হাসপাতালে নেওয়ার পর মারা যান আরও ৬ জন। আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন কয়েকজন।

নিহতরা হলেন- রংপুরের পীরগঞ্জ থানার রাজারামপুর গ্রামের সালাহউদ্দিন (৪৪), তার স্ত্রী শামসুননাহার (৩৫), তাদের সন্তান সাজিদ (১৯) ও সাবা (৮), শামসুননাহারের বোন কামরুননাহার (৩৮), পীরগঞ্জ সদরের তাজুল ইসলাম ভুট্টু (৪০), তার স্ত্রী মুক্তা (৩৫), সন্তান ইয়ামিন (১৪), দাঁড়িকা পাড়া গ্রামের মোখলেসুর (৪৫), তার স্ত্রী পারভীন (৩৫), দুরামিঠিপুরের শহীদুল (৪৫), বড় মজিদপুর গ্রামের ফুল মিয়া (৪০) ও তার স্ত্রী নাজমা বেগম (৩৫) এবং তাদের সন্তান সুমাইয়া (৮), সাবিহা (৪) ও ফয়সাল আহমেদ (১৩) এবং চালক হামিদ উদ্দীন পচা (২৮)।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রাজশাহী থেকে ছেড়ে আসা হানিফ পরিবহনের বাসটি বেপরোয়া গতিতে আসছিল। কাটাখালী থানার সামনে আসামাত্র এ দুর্ঘটনা ঘটে। মাইক্রোবাসের সিলিন্ডার বিস্ম্ফোরণের পর কয়েক যাত্রী মহাসড়কের ওপর পড়ে যান। হানিফ পরিবহনের বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার ডানপাশে গিয়ে পড়ে। এ সময় স্থানীয়রা দৌড়ে এসে রাস্তার ওপরে পড়ে থাকা কয়েকজনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠান। কিন্তু মাইক্রোবাসের ভেতরে থাকা ১১ জনকে কোনোভাবেই বের করা যাচ্ছিল না। আগুনের লেলিহান শিখায় গাড়ির ধারেকাছেও যাওয়া যাচ্ছিল না। পরে খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা এসে দীর্ঘক্ষণ চেষ্টা করে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন।

দুর্ঘটনায় সপরিবারে নিহত নাজমা বেগমের ভাই রাজশাহী সেনাবাহিনীতে কর্মরত সার্জেন্ট নুর মোহাম্মদ বলেন, বোনের পরিবারসহ আরও চারটি পরিবারের সদস্যরা রাজশাহীতে বেড়াতে আসতে চেয়েছিল। ২৬ মার্চ বিভিন্ন কর্মসূচি থাকে বলে তাদের আসতে নিষেধ করেছিলাম। কিন্তু বোন বলল, ছুটির দিন ছাড়া ব্যবসা রেখে আসা যাবে না। তাই তারা পীরগঞ্জ থেকে আসছিল। আমাকে বলেছিল, দুপুরে বাসায় খাবে। সে অনুযায়ী খাবার ব্যবস্থা করেছিলাম। সকালেই তারা চলে যেত। তাদের গাড়িটি যখন নাটোরে তখনও আমাকে ফোন করে বাসায় খাওয়ার কথা জানায়। এর পর দুপুর ২টার পরও তারা না এলে ফোন করতে থাকি। কিন্তু বোনের নম্বর বন্ধ পাই। শহরের রেলগেট এলাকায় এলে শুনতে পাই মানুষ বলাবলি করছে, কাটাখালীতে দুর্ঘটনা ঘটেছে। রংপুরের মাইক্রোবাসের সবাই মারা গেছে। শুনেই দৌড়ে কাটাখালী থানায় আসি। এখানকার কর্মকর্তারা জানান, মাইক্রোবাসের সবাই মারা গেছে।

রাজশাহী ফায়ার সার্ভিসের উপ-পরিচালক আব্দুর রশীদ জানান, তারা খবর পেয়ে দ্রুত ছুটে আসেন। এসে দেখেন আগুন জ্বলছে মাইক্রোবাসে। তারা দীর্ঘ সময় চেষ্টা করে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। ততক্ষণে মাইক্রোবাসের ভেতরে থাকা ১১ জন পুড়ে মারা যান। পরে তাদের লাশ বের করে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়।

রাজশাহী নগর পুলিশ কমিশনার আবু কালাম সিদ্দিক বলেন, সিসিটিভি ফুটেজে দেখেছি, হানিফ পরিবহনের বাসটি বেপরোয়া গতিতে আসছিল। মাইক্রোটিকে সামনে থেকে ধাক্কা দিয়ে অন্তত ২০ গজ দূরে ঠেলে নিয়ে একটি লেগুনার সঙ্গে ধাক্কা লাগায়। তখনই মাইক্রোবাসের পেছনে থাকা গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ ঘটে। এতে এতগুলো মানুষের প্রাণ মুহূর্তেই নিভে যায়। সিলিন্ডার বিস্ম্ফোরণ না হলে নিহতের সংখ্যা এত বেশি হতো না। সিলিন্ডার বিস্ফোরণের কারণেই এত মানুষ মারা গেল। হানিফ পরিবহন বেপরোয়াভাবে গাড়ি না চালালে এ দুর্ঘটনা এড়ানো যেত। হানিফ পরিবহন রং সাইডে গিয়ে মাইক্রোবাসটিকে ধাক্কা দিয়েছে।

রামেক হাসপাতালে সন্ধ্যায় গিয়ে জানা যায়, সেখানে আহত অবস্থায় ভর্তি রয়েছেন হিরা, আবুল হোসেন পাপ্পু, সাজেদুর ও পাভেল। মাইক্রোবাসের যাত্রী পীরগঞ্জের দাঁড়িকাপাড়া গ্রামের মোখলেসুরের ছেলে পাভেলই (১৭) একমাত্র বেঁচে আছেন।

Print Friendly, PDF & Email

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

Leave A Reply

Your email address will not be published.