বিভিন্ন জেলায় মাদ্রাসাছাত্রদের তাণ্ডব, অগ্নিসংযোগ-ভাঙচুর

- Advertisement -

নিউজ ডেস্ক:
নরেন্দ্র মোদীর আগমনকে ঘিরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একদল মাদ্রাসাছাত্র শহরে ব্যাপক তাণ্ডব চালিয়েছে। শুক্রবার দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এই তাণ্ডব চলাকালে তারা ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলওয়ে স্টেশনে অগ্নিসংযোগ ও ভাংচুর চালায় তারা। এ কারণে বিকাল থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-সিলেট ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে।

অপরদিকে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর দিনে চট্টগ্রামের হাটহাজারিতে থানা ও বিভিন্ন সরকারি স্থাপনায় হেফাজত ইসলাম কর্মীদের হামলার পর সংঘর্ষে চারজন নিহত হওয়ার খবর দিয়েছে পুলিশ। হাটহাজারীর বড় মাদ্রাসা হিসেবে পরিচিত দারুল উলুম মুঈনুল ইসলাম থেকে শুক্রবার দুপুরে জুমার নামাজের পর কয়েক হাজার হেফাজত কর্মী লাঠিসোঁটা নিয়ে বিভিন্ন স্থানে হামলা চালায়।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া রেলওয়ে থানা পুলিশের ওসি মাজহারুল করিম জানান, শুক্রবার দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এই তাণ্ডব চলাকালে তারা ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলওয়ে স্টেশনে অগ্নিসংযোগ ও ভাংচুর চালিয়েছে। বিকাল থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-সিলেট ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে বলে জানান তিনি। সন্ধ্যায় শহর ও আশপাশ এলাকায় বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বিকালে বিক্ষুব্ধ মাদ্রাসা ছাত্ররা জেলা শহরের কাউতলি এলাকায় পুলিশ সুপারের কার্যালয় এবং ২ নম্বর পুলিশ ফাঁড়িতে হামলা করে। তারা জেলা শহরের বঙ্গবন্ধু স্কয়ার, আব্দুল কুদ্দুস মাখন মুক্তমঞ্চ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌরসভা, পৌর মার্কেট, ইন্ডাস্ট্রিয়াল স্কুল, ফায়ার সার্ভিস স্টেশন এলাকায় টানানো ব্যানার, ফেস্টুন, পোস্টার ছিঁড়ে অগ্নিসংযোগ করেন। তারা বিভিন্ন আরও বিভিন্ন স্থাপনায় ভাঙচুর চালায়।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার মো. শোয়েব আহমেদ বলেন, “বিকালে কয়েকশ মাদ্রাসাছাত্র স্টেশনে এসে হামলা চালায়। এ সময় তারা প্যানেল টিকিট কাউন্টার, প্যানেল বোর্ড ও যাত্রীদের চেয়ার ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। এতে ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-সিলেট ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।”

Brahmanbaria Pi
আখাউড়া রেলওয়ে থানার ওসি মাজহারুল করিম বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলওয়ে স্টেশনে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় বিকাল ৪টা থেকে ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে। এর ফলে সিলেট থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী আন্তঃনগর জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস ট্রেনটি আজমপুর রেলওয়ে স্টেশন ও চট্টগ্রাম থেকে আসা ঢাকাগামী মহানগর এক্সপ্রেস ট্রেনটি আখাউড়া রেলওয়ে স্টেশনে আটকা পড়ে আছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেল স্টেশনে জিআরপি পুলিশ ফাঁড়িতেও হামলা হয় বলে তিনি জানান। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পুলিশ সুপার মো. আনিসুর রহমান বলেন, “মাদ্রাসাছাত্ররা মিছিল করে বিভিন্ন স্থানে ভাঙচুর করেছে। এটিকে প্রতিরোধ করার জন্য আমরা আমাদের কার্যক্রম চালিয়েছি। শহরের পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণে আছে। এ ঘটনায় দোষীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

Brahmanbaria Pic২৫ বিজিবির কমান্ডিং অফিসার লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. ফেরদৌস কবির বলেন, এখন পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহর ও আশপাশ এলাকায় শুক্রবার সন্ধ্যায় পাঁচ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে।

সন্ধ্যায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রেসক্লাবে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সংবাদ সম্মেলন করে এ ঘটনার তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এ ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি করেন। তিনি বলেন, তারা পুলিশ সুপারের অফিস, সদর থানা, সার্কিট হাউস, জেলা শিল্পকলা একাডেমীসহ স্বাধীনতার পক্ষের বিভিন্ন স্থাপনা ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করেছে।

চট্টগ্রামে হেফাজতের তাণ্ডব, নিহত ৪ :

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বেলা সোয়া ২টার দিকে হাটহাজারী বড় মাদ্রাসা থেকে কয়েক হাজার হেফাজতকর্মী মিছিল নিয়ে বের হয়। এসময় তারা হাটহাজারী থানা, ইউনিয়ন ভূমি অফিস ও ডাক বাংলোতে হামলা চালায়।

চট্টগ্রাম জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (উত্তর) মছিউদ্দৌল্লাহ রেজা বলেন, “মাদ্রাসা থেকে বের হয়ে বিনা উসকানিতে হেফাজত কর্মীরা থানায় হামলা চালায়। তারা থানা কম্পাউন্ডে ব্যাপক ভাঙচুর করে।”

হাটহাজারীর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুহুল আমিন বলেন, “হেফাজতে ইসলামের কর্মীরা ইউনিয়ন ভূমি অফিস ও ডাক বাংলোতে হামলা ও ভাঙচুর চালায়। পাশাপাশি তারা ভূমি অফিসে অগ্নিসংযোগও করে। সহকারী কমিশনারের (ভূমির) গাড়িতেও তারা আগুন দেয়।

“আগুন নেভাতে ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা এলে হেফাজতের কর্মীরা ভূমি অফিসে প্রবেশে তাদের বাধা দেয়।”

পরে পুলিশের ধাওয়ার খেয়ে হেফাজত কর্মীরা মাদ্রাসা গেইটে অবস্থান নিয়ে চট্টগ্রাম খাগড়াছড়ি সড়ক অবরোধ করে। বিকাল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত সড়কে তাদের অবরোধ অব্যাহত ছিল বলে ইউএনও জানান।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির এএসআই শীলব্রত বড়ুয়া বলেন, “হাটহাজারীর সংঘর্ষে আহতদের মধ্যে পাঁচজনকে হাসপাতালে আনা হয়। তাদের মধ্যে চারজনকে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।”

হতাহতরা সবাই গুলিবিদ্ধ বলে জানালেও তাৎক্ষণিকভাবে তাদের পরিচয় নিশ্চিত করতে পারেনি পুলিশ।

এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আজিজুল হক ইসলামাবাদী বলেন, “পুলিশের হামলায় চারজন নিহত হয়েছেন। এরা সকলেই হেফাজতে ইসলামের কর্মী।”

আজিজুল হক ইসলামাবাদীর ভাষ্য, নিহতদের নাম রবিউল, মেহরাজ, আবদুল্লাহ ও জামিল। তাদের মধ্যে তিনজন হাটহাজারি বড় মাদ্রাসার শিক্ষার্থী, একজন দর্জির কাজ করতেন।

২০১০ সালে দেশের কওমী মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামের আত্মপ্রকাশ হয়। নারী নীতি, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে দেশে ২০১৩ সালে গড়ে উঠা গণজাগরণ মঞ্চের বিরোধীতা করে দেশে ব্যাপক নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে।

২০১৩ সালের ৫ মে ঢাকার মতিঝিল শাপলা চত্বরে অবস্থান করে ব্যাপক অরাজকতা চালায় সংগঠনটি। এই সংগঠনটি মূলত হাটহাজারী বড় মাদ্রাসা হিসেবে পরিচিত দারুল উলুম মুঈনুল ইসলাম থেকে পরিচালিত হয়।

বায়তুল মোকাররম এলাকায় ব্যাপক সংঘর্ষ :

বাংলাদেশে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর আগমনকে কেন্দ্র করে রাজধানী ঢাকার বায়তুল মোকাররম মসজিদ এলাকায় পুলিশের সাথে সংঘর্ষে জড়িয়েছে বিক্ষোভকারীরা। জানা গেছে- জুমার নামাজের পর হঠাৎ করে একদল লোক মোদী-বিরোধী শ্লোগান দিয়ে মিছিল শুরু করলে পুলিশ তাতে বাধা দিলে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ মূহুর্মূহু কাঁদানে গ্যাস ও রাবার বুলেট ছোঁড়ে, অন্যদিকে বিক্ষোভকারীরাও ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেছে। এতে সাংবাদিকসহ বেশ কয়েকজনের আহত হবার খবর পাওয়া গেছে। পুরো এলাকায় পুলিশ সাঁজোয়া যান ও জলকামান নিয়ে অবস্থান নেয়।

জানা গেছে জুমার নামাজের পর একদল ব্যক্তি শ্লোগান দিতে শুরু করলে মসজিদের উত্তর দিক থেকে অপর একদল ব্যক্তি তাদের ওপর হামলা করে। এ সময় সেখানে উভয় পক্ষের মধ্যে মারামারি হয় এবং এক পর্যায়ে মোদী বিরোধীরা মসজিদের ভেতরে ঢুকে পড়ে।

তবে কিছুক্ষণ পর তারা আবার সংগঠিত হয়ে পাল্টা হামলার চেষ্টা করলে তখন আবার কিছুক্ষণ এ সংঘর্ষ চলে। এর মধ্যে পুলিশ এসে মোদী বিরোধীদের লক্ষ্য করে কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ ও ফাঁকা গুলি ও রাবার বুলেট ছোঁড়ে। পাশাপাশি পুলিশ ও র‍্যাব চারদিক থেকে মসজিদ এলাকা ঘিরে ফেলে। বেলা প্রায় তিনটা পর্যন্ত দফায় দফায় সংঘর্ষে কার্যত পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।

পরে পরিস্থিতি আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিয়ন্ত্রণে নিতে পারলেও বিকেল চারটার দিকেও মসজিদের ভেতরে এক দল ব্যক্তিকে দেখা গেছে আহত কয়েকজনকে শুশ্রুষা করতে। এর আগে গত কয়েকদিন ধরেই নরেন্দ্র মোদীর ঢাকা সফরের প্রতিবাদে পৃথকভাবে নানা কর্মসূচি পালন করছেন কিছু ইসলামপন্থী ও বাম ধারার কয়েকটি সংগঠন। বৃহস্পতিবার দুপুরেও ঢাকার মতিঝিল এলাকায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।

সূত্র : বিডিনিউজ২৪.কম

Print Friendly, PDF & Email

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

Leave A Reply

Your email address will not be published.